বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করা এফসিটিসিতে অনেক ভারী ভারী বিষয় আছে। সহজ করে বললে এটা আমাদের পুরো দুনিয়ায় তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য এক ধরনের বাইবেল সমতুল্য। এর মূল কথা হলো, সরকার তামাক কোম্পানির সঙ্গে এমনভাবে বসতে পারবে না,যাতে জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বসলে অবশ্যই প্রকাশ্যে বসতে হবে।
কিন্তু দুঃখজনক হলো, অতীতের মতো এখন তামাক কোম্পানির সাথে বসার কথা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। বর্তমানে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনীর জন্য একটি টাস্কফোর্স কমিটি করা হয়েছে, মাননীয় অর্থ উপদেষ্টার নেতৃত্বে। টাক্সফোর্স কমিটির প্রধান বলছেন, “তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনীর জন্য অধিকতর আলোচনার জন্য তামাক কোম্পানির সঙ্গেও বসতে হবে। “ অথচ আমরা জানি, তামাক কোম্পানি কীভাবে কূটকৌশলে কাজ করে।
আমার তামাক নিয়ন্ত্রণ সাংবাদিকতার ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, কোম্পানির পক্ষ থেকে গোপনে নীতি নির্ধারকদের বিভ্রান্তি করে আইনের সংশোধন ঠেকানোর চেষ্টা করে। যেমন ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ সালে আমি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিলাম। যখন তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের পক্ষে বিপক্ষে মতামত নিতে সরকারের ন্যাশনাল টোবাকো কনট্রোল সেল (এনটিসিসি) ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী খসড়া আইন ওয়েবসাইটে দেয়ার পর প্রক্রিয়া অনুযায়ী চুড়ান্ত করা হয়।
আইন সংশোধন ঠেকাতে তামাক কোম্পানির ভূয়া চিঠির ছড়াছড়ি
আমরা দেখলাম প্রায় ১,১০০টি চিঠি এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন হলে বাংলাদেশে ১৫ লক্ষ সিগারেট বিক্রেতা পথে বসবে। সরকার বিশাল অংকের সরকার রাজস্ব হারাবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১,১০০টি চিঠির বক্তব্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হুবহু এক ও অভিন্ন। শুধুমাত্র সংগঠনের প্যাডে নাম আর স্বাক্ষর আলাদা। কখনো অর্থনীতিবিদের নামে, কখনো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোকান মালিক সমিতির নামে দেয়া হয়েছে। দেশের ৬৪ জেলা থেকে নাম সর্বস্ব এসব দোকান মালিক সমিতির নামে দেয়া চিঠিগুলোর সবই তামাক কোম্পানির তৈরি ভুয়া চিঠি। জালিয়াতি করে তারা চিঠিগুলো পাঠিয়েছে আইন সংশোধনী ঠেকাতে। আমি যাদের নামে চিঠিগুলো পাঠানো হয়েছিল এমন বেশ কয়েক জনের সাক্ষাৎাকার গ্রহণ করি এবং তারা সকলেই বলে যে এসব চিঠি তারা দেয়নি। এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনীর বিষয়ে তাদের কোনো ধারনাও নেই।
আইন সংশোধনী ঠেকাতে জালিয়াতির মাধ্যমে এসব চিঠির মধ্যে একজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদের নাম রয়েছে। যিনি বর্তমানে সরকারের বড় দায়িত্বে আছেন। তার নামে এমন একটি চিঠি দেয়ায় আমি তাকে বলেছিলা, “স্যার,আইনের সংশোধনীর বিরুদ্ধে আপনার বক্তব্যের সাথে সারা দেশের বিভিন্ন দোকান মালিক সমিতির নামে দেয়া চিঠি এক এবং অভিন্ন। তাহলে আপনি ওনাদের লেখা কপি করেছেন নাকি ওনারা আপনার লেখা কপি করেছে?” প্রশ্ন শুনে তিনি এ নিয়ে আমার ওপর রেগে যান। কারণ প্রকৃত বাস্তবতা হলো,সব চিঠিই একটি বহুজাতিক সিগারেটে কোম্পানির CSR তহবিলের অর্থে জালিয়াতির মাধ্যমে বানানো এবং জমা দেয়া হয়েছিল আইন সংশোধনের বিরোধিতা করার জন্য।
অন্যদিকে যারা সমর্থন জানিয়েছিল, তারা ছিল জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কাজ করা সংগঠনগুলো। তখন একাত্তর টেলিভিশনের আমার ঐ প্রতিবেদনের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের নীতি নির্ধারকদের অন্তত বোঝাতে পেরেছিলাম যে—এই যে বিরোধিতা আসলে তামাক কোম্পানির ছদ্মবেশী প্রচারণা। তারা গোপনে বিভিন্ন জনের নামে চিঠি দিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারকদের বিভ্রান্ত করে।
রাজস্ব হারানোর মিথ
এবার রাজস্বের প্রসঙ্গে আসি। ২০২৪ সালে ও ২০২৫ সালে সিগারেটের ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন রস্তরের ট্যাক্স রেট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ফলে এখন সিগারেটের সব স্তরে একীভূত ট্যাক্স সিস্টেম হয়েছে। কর হার সমান হয়েছে। ট্যাক্স রেট বৃদ্ধিসহ কিছু কারণে এবার সিগারেট উৎপাদন খানিকটা কমেছে, কিন্তু রাজস্ব বেড়েছে। এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ও জেটিআই থেকে সরকার পেয়েছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা বা ৩৫০ বিলিয়ন ডলার টাকা। সদ্য বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিগারেট থেকে রাজস্ব পাওয়া গেছে ৩৬,৭৬১ কোটি টাকা বা ৩৬৭ বিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ ট্যাক্স বাড়ালে রাজস্ব কমে না বরং বৃদ্ধি পায়। এর প্রমাণ উঠে এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে।তাই ট্যাক্স বাড়ালে রাজস্ব কমবে সরকারের নীতি নির্ধারকদের যে ভয় দেখায় কোম্পানি তা যে মিথ্যা এবং প্রোপাগান্ডা তাও প্রমাণ হয়েছে।
নামমাত্র সরকারি শেয়ারের অজুহাতে সচিবদের বোর্ডে পরিচালক করে বিএটি
আমরা আরও দেখছি গত বছর পর্যন্ত বিএটিতে সরকারের নামমাত্র শেয়ারের অজুহাতে ৩ জন সচিবকে নিজেদের পরিচালনা পর্ষদে রাখতো বিএটি। কৌশলে সচিবদের বোর্ডে রেখে প্রভাব বিস্তার করতেই তারা এই কূটকৌশল করতো। এ নিয়ে আমার ধারাবাহিক সংবাদ, গবেষণা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণের কর্মীদের প্রতিরোধের কারণে এখন আর বিএটির বোর্ডে সরকারের কোনো নেই। যা ইতিবাচক। তবে এখনও অনেকে বলে থাকেন বিএটিতে সরকারের শেয়ার আছে ৯ শতাংশ। আসলে তা ঠিক নয়, কারণ মহামান্য রাষ্ট্রপতির নামে বিএটিতে শেয়ার আছে মাত্র ০.৬৪%। বাকি কিছু শেয়ার আছে সরকারের শেয়ার লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ- আইসিবি, সাধারণ বীমা করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক- বিডিবিএলের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে। এরা পুজিবাজারে শেয়ার কেনা বেচা করে মাত্র। তাই সরকারি মালিকানা নামমাত্র অর্থাৎ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
সরকারি শুল্ক ছাড়ে বাংলাদেশে তামাক পাতার চাষ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে
নতুন করে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে বাংলাদেশে তামাক চাষ দ্রুত গতিতে লাফিয়ে বাড়ছে। ২০২৪ সালে এক বছরে প্রায় ৫০,০০০ একর জমিতে তামাক চাষ বেড়েছে। কারণ আগে তামাক পাতা রপ্তানি করলে ২৫% শুল্ক দিতে হতো সরকারকে। কিন্তু সেটি প্রত্যাহার করেছে এনবিআর।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের তামাক পাতা রফতানির শুল্ক প্রত্যাহার করেছিলেন এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুইয়া, যিনি শিল্প সচিব থাকার সময় ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকোর বোর্ডে পরিচালক হিসাবে ছিলেন। বিএটি মোশাররফ হোসেনদের মতো সচিবদের বোর্ডে পরিচালক হিসাবে রাখে এই ধরনের সরকারি নীতি সুবিধা পেতেই। তারই একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হলো এই তামাক পাতা রফতানির শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি।
একদিকে তামাক পাতা রফতানিতে শুল্ক নেই অন্যদিকে বাংলাদেশের তামাক পাতার দাম বিশ্বে সবচেয়ে কম।প্রতিযোগী ভারত, পাকিস্তান, চীন, ব্রাজিলসহ সব দেশের চেয়ে বাংলাদেশে তামাক পাতার দাম কম। এ কারণে বাংলাদেশে তামাক পাতার চাষ বাড়িয়ে বিদেশে রফতানি করে শত শত কোটি টাকা মুনাফা করছে বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানিগুলো। সস্তায় এখান থেকে সিগারেট তৈরির কাঁচামাল তথা তামাক পাতা কিনে বিদেশে সিগারেট বানিয়ে হাজার কোটি টাকা মুনাফা করছে সিগারেট কোম্পানিগুলো।
বাংলাদেশে ই-সিগারেটের কারখানা স্থাপনের চেষ্টা
নতুন করে যুক্ত হয়েছে ই-সিগারেটের কারখানা স্থাপনের তোড়জোড় চলছে দেশে। বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানি ফিলিপ মরিস, চাইনিজ ও ভারতীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ই-সিগারেট পণ্য তৈরীর কারখানা করার জন্য আবেদন করেছে। সরকার ইতিমধ্যে অনুমোদনও দিয়েছে। এতে বাংলাদেশকে ই-সিগারেট ও তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্রে পরিণত করা হচ্ছে। যদিও সরকার ই-সিগারেট আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো আইনের ফাঁক গলে দেশে ই সিগারেট, ভ্যাপ ও হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট তৈরির করার উদ্যোগ নিয়েছে রফতানির কথা বলে।
সবশেষে বলবো, আমাদের লক্ষ্য শুধু রাজস্ব নয়, জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা। আপনারা যারা এফসিটিসিতে স্বাক্ষর করে এবং তামাক নিয়ন্ত্রণের নানাবিধ উদ্যোগ নিয়ে আমাদের পথ দেখিয়েছেন,আগামীতেও আমাদের নেতৃত্ব দেবেন। এই আশা নিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি। ৩১ জুলাই ২০২৫ তারিখে আহসানিয়া মিশন কর্তৃক আলোচনা সভায় আমার বক্তব্যের ভিডিও লিংক যুক্ত করেছি।
লেখক: সুশান্ত সিনহা, তামাক নিয়ন্ত্রক গবেষক ও বিশেষ প্রতিনিধি,একাত্তর টেলিভিশন sinhasmp@yahoo.com