জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের বৃহস্পতিবার সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার তাদের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই যেসব বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, তার মধ্যে অন্যতম রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা।
বরাবরের মতোই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের প্রাথমিক ও ধাপে ধাপে কার্যক্রম শুরু করেছে। বাজেটকে কেন্দ্র করে কেবল সরকারই নয়, তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মীরাও তৎপর হয়ে উঠেছেন। একই সময়ে সিগারেট কোম্পানিগুলোও এনবিআরসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে তদবির শুরু করে দিয়েছে। ফলে ফেব্রুয়ারি থেকেই সিগারেটসহ সব তামাকজাত পণ্যের মূল্য ও কর বৃদ্ধির বিষয়ে দেশি-বিদেশি নানা সংস্থার পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তাবনা আসতে থাকে। একাত্তর টেলিভিশনের সাংবাদিক ও তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক সুশান্ত সিনহার বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশে সিগারেটের কর কাঠামো পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যন্ত জটিল। এনবিআরের রাজস্ব আদায় ও নজরদারি ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর না হওয়ায় এই বহুস্তরবিশিষ্ট কর কাঠামো আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর ফলে তামাক কোম্পানিগুলোর কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগও অনেক বেশি।
বিশেষ করে কর না বাড়িয়ে প্রতিবছর সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধি করার মাধ্যমে নীতিনির্ধারকেরা সিগারেট কোম্পানিগুলোকে নির্বিঘ্ন মুনাফা করার সুযোগ করে দিয়েছেন। কর না বাড়িয়ে কেবল মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব আপাতদৃষ্টিতে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় বাড়ালেও বাস্তবে এটি তামাক কোম্পানিগুলোর জন্য বিপুল মুনাফার পথ খুলে দেয়। এই পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে আত্মঘাতী।
তামাক নিয়ন্ত্রণ সাংবাদিক হিসেবে তামাক কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধির কোনো প্রস্তাব সমর্থনের সুযোগ নেই। কারণ কোম্পানির অতিরিক্ত মুনাফা মানেই ‘মৃত্যুর ব্যবসা’ আরও বিস্তৃত করা। বাড়তি মুনাফা হলে তারা প্রশাসনসহ সমাজের সর্বস্তরে প্রভাব বিস্তার করবে—যা জনস্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য ভয়াবহ।

বাংলাদেশে চার স্তরে সিগারেট উৎপাদনের চিত্র:
বাংলাদেশের সিগারেটের কর কাঠামো বুঝতে হলে আগে স্তরভিত্তিক উৎপাদন, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) এবং বাজার অংশীদারিত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। বাংলাদেশে সিগারেট মূল্যের ভিত্তিতে চারটি স্তরে বিভক্ত প্রিমিয়াম, উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন স্তর।
প্রিমিয়াম স্তরে বেনসন, মালবোরোসহ সিগারেটের প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৮৫ টাকা। এ স্তরে মোট উৎপাদন ৪৬৫ মিলিয়ন শলাকা, যা মোট সিগারেটের ৭ দশমিক ১১ শতাংশ।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দাম উচ্চ স্তরের সিগারেটের। গোল্ড লিফসহ এ স্তরের প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটের এমআরপি ১৪০ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই স্তরে উৎপাদন হয়েছে ১৮৬ মিলিয়ন শলাকা, যা মোট উৎপাদনের ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যম স্তরের সিগারেটের বাজার অংশীদারিত্ব দ্রুত বাড়ছে। এ স্তরের প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৮০ টাকা। এখানে মোট উৎপাদন হয়েছে ১৯ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন শলাকা, যা মোট সিগারেটের ৩০ দশমিক ২৫ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় নিম্ন স্তরের সিগারেট। এই স্তরের সিগারেটের দাম বিশ্বের মধ্যে অন্যতম কম। সস্তা দামের কারণে ব্যবহার বেশি। প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটের এমআরপি মাত্র ৬০ টাকা। এই স্তরে উৎপাদন ৩৯ দশমিক ১২ বিলিয়ন শলাকা, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের মোট সিগারেটের প্রায় ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম স্তরের। দাম কম হওয়ায় ব্যবহার বেশি এবং রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি সর্বাধিক নিম্ন স্তরে।
সিগারেটের বাজারের অংশীদারিত্ব: বহুজাতিক বনাম দেশীয় কোম্পানি :
এই নিম্ন ও মধ্যম স্তরের বাজার কার্যত বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট সিগারেটের প্রায় ৭৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি)। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজার অংশীদার আরেক বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানি জাপান টোব্যাকো (জেটিআই) এর। যাদের দখলে ১২ দশমিক ২১ শতাংশ। ২০১৮ সালে দেশিয় কোম্পানি আকিজ টোব্যাকোর।

সব মিলিয়ে দুই বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানির বাজার অংশীদারিত্ব ৮৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। দেশীয় কোম্পানির মধ্যে শীর্ষে রয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপ, যাদের বাজার অংশীদারিত্ব ১০ দশমিক ২৮ শতাংশ। বাকি দশমিক ৫ শতাংশ রয়েছে অন্যান্য দেশীয় কোম্পানির হাতে। ঢাকা টোব্যাকো (Dhaka Tobacco) মূলত United Dhaka Tobacco Company Limited নামে পরিচিত ছিল, যা বর্তমানে JT International Bangladesh Limited নামে পরিচিত এবং একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ২০১৮ সালে Japan Tobacco International আকিজ গ্রুপের ঢাকা টোব্যাকোর সিগারেট ব্যবসা ১২,৪৩০ কোটি টাকায় কিনে নেয়। এটি বাংলাদেশে একক কোম্পানির মধ্যে সর্বোচ্চ বিনিয়োগের শীর্ষে রয়েছে এবং বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জাপান টোব্যাকো গ্রুপের অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় জাপান টোব্যাকোর বাজার অংশীদারিত্ব প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। একইভাবে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপের বাজার শেয়ার। তবে কারখানা স্থানান্তরের কারণে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর উৎপাদন কিছুটা কমায় তাদের বাজার অংশীদারিত্ব প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ফলে চোরাচালান নয়, বিএটির উৎপাদন যতটুকু কমেছে, ঠিক ততটুকুই বাজার দখল করেছে তাদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি।
লেখক: প্ল্যানিং এডিটর, একাত্তর টেলিভিশন, ও তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক, sinhasmp@yahoo.com