গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি আয়োজিত সাংবাদিক ও তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের জন্য আয়োজনকৃত প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করি ১২ মার্চ। এই আলোচনায় আমি তুলে ধরেছি, কীভাবে তামাক চাষ ও তামাক শিল্পের কর ফাঁকি কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক ও সাংবাদিক হিসেবে, তিনজন প্যানেলিস্টের একজন হিসেবে এই তামাক কর বিষয়ক সাংবাদিকদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে অংশ নিতে পারায় আমি আনন্দিত। নিচে বিস্তারিত তুলে ধরছি আমার আলোচনাসহ অন্যান্য আলোচক ও প্রবন্ধ উপস্থাপকের বক্তব্য।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) কার্যালয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের ১৫ জন সাংবাদিক ও তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের জন্য আয়োজিত এক ওরিয়েন্টেশন কর্মশালায় এ মতামত তুলে ধরা হয়। কর্মশালাটি যৌথভাবে আয়োজন করে ইকোনমিক্স ফর হেলথ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো-ফ্রি কিডস (CTFK), ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্স (IHE)। তামাকজাত পণ্যের মূল্য ও কর কাঠামো সংস্কার করে রাজস্ব বাড়ানো এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, কার্যকর কর সংস্কার বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন সম্ভব। একই সঙ্গে তামাক ব্যবহার কমিয়ে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ও পরিচালক ড. শাফিউন এন. শিমুল। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সিগারেটের দাম প্রতিবেশী দেশের তুলনায় এখনও কম। দেশের সিগারেট বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম মূল্যের সিগারেট দ্বারা দখল। তামাকজনিত রোগে প্রতিবছর স্বাস্থ্য ব্যয় হয় প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত কর সংস্কার বাস্তবায়িত হলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে।”

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, “তামাক নিয়ন্ত্রণকে একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক নীতি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। এটি শুধুমাত্র ধূমপায়ীদের শাস্তি নয়; বরং কর, বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ ও বিজ্ঞাপন সীমিতকরণের মাধ্যমে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা যায়। এটি মূলত সংকীর্ণ মুনাফাকেন্দ্রিক স্বার্থ ও বৃহত্তর জনস্বার্থের মধ্যে প্রতিযোগিতা। সমাজকে অবশ্যই জনস্বার্থের পাশে দাঁড়াতে হবে।”
কর্মশালায় তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক ও একাত্তর টেলিভিশনের প্ল্যানিং এডিটর সুশান্ত সিনহা বলেন, “বাংলাদেশ শুধু তামাকজাত পণ্য ব্যবহারকারী বিশ্বের শীর্ষ আট দেশের একটি নয়, তামাক চাষেও বিশ্বের ১২তম অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশেই তুলনামূলকভাবে কম দামে সিগারেট ও তামাক পাতা পাওয়া যায়।
তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে একদিকে তামাক কর বাড়াতে হবে, অন্যদিকে তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ২০১৮–১৯ অর্থবছরে তামাক পাতা রপ্তানির ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের পর দেশে তামাক চাষ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার মার্কেটিং (ডিএএম)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২–২৩ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৯৩ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ হয়েছিল। যা ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার একর জমিতে।
সুশান্ত সিনহা বলেন, সবয়ে বড় কথা, তামাক পাতার দাম নির্ধারণী সরকারি কমিটি ২০০৬ সালে সংশোধন করে চারটি তামাক কোম্পানির প্রতিনিধি অন্তভুক্ত করা হয়েছে। যদিও ১৯৭৭ সালে কমিটি গঠনের সময় কোনো কোম্পানির প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এটি একটি স্পষ্ট Conflict of Interest। তাই কমিটি থেকে কোম্পানির প্রতিনিধিদের বাতিল করা এবং তামাক পাতা রফতানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক পুনর্বহাল করা জরুরি। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে সিগারেটের বহুস্তর বিশিষ্ট জটিল কর কাঠামোয় অ্যাড ভ্যালোরামের ভিত্তিতে কর ও মূল্য নির্ধারণ করা হয়। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অন্যান্য দেশের মতো সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করাও জরুরি। আমার প্রস্তাব, আসন্ন ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে প্রতি শলাকা সিগারেটে ১ টাকা নির্দিষ্ট কর আরোপ করা হলে সরকার বছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব পেতে পারে। এতে সিগারেটের দাম বাড়বে এবং কোম্পানির অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ কমে যাবে।”
একাত্তর টেলিভিশনের প্ল্যানিং এডিটর সুশান্ত সিনহা আরও বলেন, “ সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP) বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কোম্পানি বর্তমানে MRP লঙ্ঘন ও কর ফাঁকি দিয়ে আসছে। সুনির্দিষ্ট কর আরোপ ও MRP বাস্তবায়ন নিশ্চিত হলে তামাক কোম্পানির অতিরিক্ত মুনাফার লাগাম টানা সম্ভব হবে। সরকারের বেঁধে দেওয়া MRP অনুযায়ী বিক্রি নিশ্চিত করার জন্য তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জরুরি।”
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন, তামাক কর জোরদার করা শুধু রাজস্ব আহরণের উপায় নয়, বরং তামাক ব্যবহার কমিয়ে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।