দ্বিতীয়বারের মতো তামাক কর কাঠামো বিষয়ক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জেনেভার টেকনিক্যাল অফিসার (Fiscal Policies for Health), ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ ডিটারমিন্যান্টস, প্রমোশন অ্যান্ড প্রিভেনশন-এর কর্মকর্তা ড. গুইলারমো এ. সানডোভাল-এর সঙ্গে। আগামী ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত তামাক কর কাঠামো নিয়েও আমরা—বাংলাদেশে তামাক কর নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক ও তামাক নিয়ন্ত্রণ সংগঠনের প্রতিনিধিরা—বিস্তারিত মতবিনিময় করেছি। এই সভা জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলে (এনটিসিসি) অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় ড. গুইলারমো এ. সানডোভাল-এর পাশাপাশি জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. শের মালিক উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় আমি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিগারেটের সরবরাহ চেইন, স্তরভিত্তিক বিদ্যমান কর কাঠামোর দুর্বলতা, এমআরপি বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা এবং কোম্পানিগুলোর সম্ভাব্য কর ফাঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরেছি। পাশাপাশি স্থানীয় তামাক কর বিশেষজ্ঞদের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছি।
বিশেষভাবে আমি উল্লেখ করেছি যে, সিগারেটের প্যাকেটে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ও খুচরা মূল্যের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে তামাক কোম্পানিগুলো কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি করে। এ ধরনের ভুল ব্যাখ্যা বা ব্যবহার নীতিগতভাবে কর ফাঁকিকে বৈধতা দিতে সহায়তা করতে পারে, যা তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার আইন করে সিগারেটের প্যাকেটে “সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য” লেখা বাধ্যতামূলক করলেও, কিছু ক্ষেত্রে তামাক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট সংগঠন এখনো “খুচরা মূল্য” শব্দটি ব্যবহার করছে। এটি সম্পূর্ণভাবে আইনবিরোধী এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে বলে আমি মতবিনিময় সভায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সামনে তুলে ধরি।
সভায় ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) এর সিনিয়র প্রজেক্ট ও কমিউনিকেশন কর্মকর্তা ইব্রাহীম খলিল তুলে ধরেন যে, “তদুর্ধ্ব” বা “and above” শব্দ ব্যবহারের কারণে সিগারেটসহ তামাকজাত দ্রব্যে কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে মূল্যভিত্তিক চারটি স্তরের মধ্যে নিম্ন স্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের এমআরপি নির্ধারণ করা হয়েছে “৬০ টাকা ও তদুর্ধ্ব” এবং মধ্যম স্তরের জন্য “৮০ টাকা ও তদুর্ধ্ব”।
এই শব্দ ব্যবহারের ফলে কোম্পানিগুলো একই স্তরের মধ্যে ৬০, ৭০ ও ৭৫ টাকার মতো বিভিন্ন দামের প্যাকেট বাজারে আনতে পারছে। পাশাপাশি এক স্তর থেকে পরবর্তী স্তর পর্যন্ত যেকোনো দামের সিগারেট বাজারজাত করার সুযোগও তৈরি হচ্ছে, যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিদ্যমান অনুমোদন কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব।ফলে একই ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে কোম্পানিগুলো বিক্রয় কাঠামোকে বিভক্ত দেখিয়ে অ্যাডভেলোরাম কর পদ্ধতিতে কর ফাঁকি দিতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, নিম্ন স্তরে ৬০ টাকার প্যাকেটে ৮৩ শতাংশ হারে কর প্রায় ৪৯.৯০ টাকা এবং ৭৫ টাকার প্যাকেটে একই হারে কর ৬২.২৫ টাকা—অর্থাৎ প্রতি প্যাকেটে প্রায় ১২ টাকার পার্থক্য তৈরি হয়। ধরা যাক, নিম্ন স্তরে ১০০ প্যাকেট সিগারেট বিক্রি হয়েছে—যার মধ্যে ৫০টি ৬০ টাকার এবং ৫০টি ৭৫ টাকার। কিন্তু কর পরিশোধের সময় যদি ৬০ টাকার প্যাকেট ৭৫টি এবং ৭৫ টাকার প্যাকেট ২৫টি দেখানো হয়, তাহলে এই মূল্য বিভাজনের মাধ্যমে প্রতি প্যাকেটে প্রায় ১২ টাকা হিসেবে মোট প্রায় ৩০০ টাকা কর ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়।

আমি ও ইব্রাহীম খলিল গত বছর যৌথভাবে এই “তদুর্ধ্ব” শব্দের কারণে সৃষ্ট কর ফাঁকির বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছি। আমাদের গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনের পর ড. সানডোভাল ও ড. শের মালিক বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং একমত হন যে, এই শব্দ ব্যবহারের ফলে একই স্তরের মধ্যে বহু দামের সিগারেট বাজারজাত করে কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি হচ্ছে—যা নীতিগতভাবে দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, সিগারেট উৎপাদনের ব্যয় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হওয়ায় মূল্য পার্থক্য মূলত কর কাঠামোর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হচ্ছে, যা সরকারের রাজস্ব ক্ষতির একটি বড় কারণ। একইসাথে বাংলাদেশের সিগারেট বাজারের বিদ্যমান কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিম্ন ও মধ্যম স্তর মিলিয়ে মোট বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এই পর্যায়ে নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করার প্রস্তাব বর্তমান প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক নয় বলে আমি মতবিনিময় সভায় তুলে ধরি।
এছাড়া এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিড়ি খাত থেকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে, বাংলাদেশে বিড়ির ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে—এমন ধারণা বাস্তব তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।