সুশান্ত সিনহা
বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে সিগারেট চোরাচালান ও নকল সিগারেট নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে আসছে বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানিগুলো এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী। ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিদেশ থেকে আসা সিগারেটের চালান ও কার্টন আটক হওয়ার খবর পাওয়া যেত দেশের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে। বিশেষ করে এপ্রিল, মে ও জুন মাসে এসব সিগারেট চোরাচালানের খবর গণমাধ্যমে বেশি প্রকাশিত হতো।
২০১৮ সালের সিগারেট চোরাচালানসংক্রান্ত সংবাদ বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণা করেছিলাম।১ জাতীয় ২০টি জাতীয় দৈনিকের চোরাচালান সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসব সংবাদের সিংহভাগই প্রকাশিত হয়েছিল এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট হয় জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে। আর সেই বাজেটে যাতে সিগারেটের ট্যাক্স বাড়ানো না হয় সেজন্য চোরাচালানের সংবাদ দিয়ে এনবিআরের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করতো সিগারেট কোম্পানিগুলো। ট্যাক্স বাড়ালে দেশে সিগারেটের চোরাচালান বাড়বে, এতে বিপুল অংকের রাজস্ব হারাবে এনবিআর তথা সরকার। এই মিথ ছড়িয়ে রাজস্ব হারানোর জুজুর ভয় দেখাতো বিএটিবি।
তবে ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে সিগারেট চোরাচালানের খবর কমতে থাকে। এর পরিবর্তে দেশের বিভিন্ন স্থানে নকল সিগারেট তৈরির কথিত কারখানা আবিষ্কারের খবর সামনে আসতে শুরু করে। অর্থাৎ চোরাচালানের খবরের জায়গা দখল করে নেয় দেশে নকল সিগারেট উৎপাদনের খবর।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নকল সিগারেটের কারখানা নিয়ে সংবাদ আরও বেড়েছে। কিন্তু এসব সংবাদ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। নকল সিগারেট তৈরির কথিত কারখানাগুলোর অবস্থান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং জব্দ করা পণ্যের বিস্তারিত তথ্যও অনেক সময় প্রকাশ করা হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযানের পর কয়েকটি বেনসন বা গোল্ডলিফ সিগারেটের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখা যায়।
এমনকি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সরকারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে বিএটিবির কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। দেশীয় সিগারেট কোম্পানি ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসায়িক চাপে ফেলতে এসব অভিযানে বিএটিবির ভূমিকা থাকার অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনশৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিএটিবির কর্মকর্তাদের উপস্থিতি!
সম্প্রতি ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা মানিকগঞ্জের বিউটি সিগারেট কারখানায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই অভিযানের সময় বিএটিবির একজন কর্মকর্তা নিজেকে প্রথমে এনবিআরের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে অংশ নেন। পরে কারখানার লোকজনের সন্দেহ হলে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি নিজেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেন। একাধিকবার পরিচয় পরিবর্তনের পর এলাকাবাসী জড়ো হলে ওই ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরে গাড়ির নিবন্ধন নম্বর (ঢাকা মেট্রো ঘ-১২-৬৩১৪) যাচাই করে সেটি বিএটিবি’র নামে নিবন্ধিত বলে জানা যায়। বিউটি টোব্যাকোর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিএটিবি’র ইন্ধনেই পরিকল্পিতভাবে তাদের কারখানায় অভিযান চালানো হয়েছিল।২
ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হয় চোরাচালান ও নকল সিগারেটের সংবাদ
বাংলাদেশে অন্যান্য পণ্যের মতো কিছু বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেটও অবৈধভাবে বিক্রি হয়। দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নকল বা জাল ব্র্যান্ডের মোড়ক ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তবে তা মোটেও উল্লেখযোগ্য নয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বিএটিবি সীমিত কিছু ঘটনাকে বড় করে উপস্থাপন করে দেশে বিপুল পরিমাণ সিগারেট চোরাচালান ও নকল হওয়ার একটি ধারণা তৈরি করছে। এর মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে নীতিগত ও ব্যবসায়িক দরকষাকষিতে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, দেশে সিগারেট চোরাচালানের প্রকৃত মাত্রার তুলনায় এর ব্যাপ্তি অনেক বেশি করে তুলে ধরা হয়। কখনো কখনো স্বল্প পরিচিত বা নামসর্বস্ব সিগারেটকে ঘিরেও নানা ধরনের প্রচারণা চালানোর অভিযোগ রয়েছে বিএটিবির বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে এনবিআর ও গণমাধ্যমে চোরাচালান এবং নকল সিগারেটের বিরুদ্ধে সরব থাকলেও সিগারেট বিক্রেতা খুচরা দোকানিদের নিবন্ধনের উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছে বহুজাতিক এই কোম্পানিটি—এমন অভিযোগও রয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের নিবন্ধন নিশ্চিত করা গেলে কারা দেশি-বিদেশি নকল বা অবৈধ সিগারেট বিক্রি করছে, তা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, চোরাচালান ও অবৈধ সিগারেট বাণিজ্য বন্ধে বিএটিবির অবস্থান কতটা আন্তরিক।
এটি শুধু বাংলাদেশের ঘটনা নয়। বিশ্বজুড়েও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিরুদ্ধে সিগারেট চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে কৌশলগত সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের Tobacco Control Research Group (TCRG)-এর গবেষক বেনোয়া গোমিস (Benoît Gomis) ও ড. অ্যালেন গ্যালাঘার (Allen Gallagher) ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর প্রায় ১৫ হাজার ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ নথি বিশ্লেষণ করে দুটি গবেষণা পরিচালনা করেন। ২০০০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ের এসব নথি গবেষকদের কাছে সরবরাহ করেছিলেন বিএটির সাবেক এক কর্মী। গবেষণার ফলাফল এবং এ বিষয়ে দুই গবেষকের সাক্ষাৎকার নিয়ে ২২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম The Examination-এ ম্যাথু চ্যাপম্যানের একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।৩
The Examination এর প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ
The Examination-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সিগারেটের অবৈধ বাণিজ্য ও চোরাচালানবিরোধী লড়াইয়ে সরকারের সহযোগী হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে ইউনিভার্সিটি অব বাথের গবেষকদের বিশ্লেষণ করা অভ্যন্তরীণ নথি কোম্পানিটির এই অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
গবেষকদের দাবি, নথিগুলোতে দেখা যায়, বিএটি সব সময় নিজেদের সিগারেটের অবৈধ বাজারে প্রবেশ ঠেকাতে আগ্রহী ছিল না। বরং কিছু ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বাজার দখল, বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জন এবং নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবে চোরাচালানবিরোধী কার্যক্রম ব্যবহার করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনটি মূলত বিএটি’র প্রকাশ্য দাবি ও অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের মধ্যে এই বৈপরীত্য তুলে ধরে। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলে তামাক কোম্পানিগুলোর চোরাচালানবিরোধী উদ্যোগ আসলে জনস্বাস্থ্য ও অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য, নাকি নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও ভাবমূর্তি রক্ষার কৌশল?
গবেষণায় কী উঠে এসেছে?
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের Tobacco Control Research Group-এর গবেষকরা ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিএটি’র একজন সাবেক কর্মীর কাছ থেকে প্রায় ১৫ হাজার অভ্যন্তরীণ নথি পান।৪ ওই কর্মী আনুমানিক ২০০০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে কোম্পানিটির অবৈধ বাণিজ্যবিরোধী বিভাগে কাজ করেছিলেন। এসব নথির কয়েক ডজন বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বিএটি’র অবৈধ বাণিজ্যবিরোধী কার্যক্রমের অভ্যন্তরীণ চিত্র তুলে ধরেন।
গবেষক বেনোয়া গোমিস ও অ্যালেন গ্যালাঘারের প্রকাশিত দুটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বিএটি’র কর্মকর্তারা কোম্পানির নিজেদের সিগারেট অবৈধভাবে বিক্রি হওয়ার ঘটনা সামনে এলেও ব্যবস্থা নিতে অনাগ্রহী ছিলেন বলে নথিতে প্রতীয়মান হয়। অন্যদিকে বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জনের জন্য চোরাচালানবিরোধী অভিযান ব্যবহারের নজিরও পাওয়া গেছে।
গবেষকদের মতে, বিএটি’র এসব কার্যক্রমের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের সিগারেটের বিক্রি বাড়ানো, প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বাজারে সুযোগ তৈরি করা এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরি করা।
The Examination-এর পক্ষ থেকে মন্তব্য চাওয়া হলেও বিএটি কোনো জবাব দেয়নি। তবে এর আগে কোম্পানিটি বলেছিল, তাদের অবৈধ বাণিজ্যবিরোধী কার্যক্রমকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার অভিযোগ তারা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। কোম্পানিটির ভাষ্য, দায়িত্বশীলতা ও সততার সঙ্গে কাজ করা তাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ভিত্তি।
গবেষকদের দাবি, বিএটি’র অভ্যন্তরীণ নথিতে এমন কিছু স্মারকলিপি পাওয়া গেছে, যেখানে অবৈধ বাণিজ্যবিরোধী কার্যক্রমের লক্ষ্য হিসেবে “Contestable Space” তৈরির কথা বলা হয়েছে। বিএটি’র নিজস্ব সংজ্ঞা অনুযায়ী, এর অর্থ হলো প্রতিটি বাজার-খণ্ডে তাত্ত্বিকভাবে সর্বোচ্চ যে ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষক বেনোয়া গোমিসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করে বিএটি বাজারে একটি শূন্যস্থান তৈরি করতে পারত। এরপর নিজেদের বৈধ পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে সেই বাজার দখলের সুযোগ তৈরি হতো।
২০১৩ সালে ইথিওপিয়ায় তৈরি বিএটি’র একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, কোম্পানিটি নিজেদের সিগারেট অবৈধ বাজারে চলে যাওয়ার প্রবণতা কমানোর ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না। কারণ ওই শূন্যস্থান পূরণের জন্য নিজেদের বৈধ পণ্য সরবরাহের উপযুক্ত ব্যবস্থা তাদের ছিল না। নথিতে বলা হয়েছিল, যেকোনো অবৈধ বাণিজ্যবিরোধী অভিযান এমন একটি বাজার-সুযোগ তৈরি করবে, যা হয় প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল, নয়তো অবৈধ ব্যবসায়ীরা কাজে লাগাবে।
গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, ২০২৩ সালে উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের তদন্তের পর বিএটি ৬২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের বেশি জরিমানা দেয়। ২০০৭ সালে বিএটি প্রকাশ্যে বলেছিল, তারা উত্তর কোরিয়ায় ব্যবসা বন্ধ করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের তদন্তে দেশটিতে অন্তত এক দশক ধরে সিগারেট সরবরাহের একটি পরিকল্পনার তথ্য উঠে আসে। এ ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরে অবস্থিত তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিনের পরিবেশক Singapura United Trading Limited-কে ব্যবহার করা হয়েছিল।
গবেষকদের পাওয়া অভ্যন্তরীণ নথিতেও এই প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। নথিতে দেখা যায়, মঙ্গোলিয়ায় বিএটি’র শুল্কমুক্ত সিগারেট বিতরণের দায়িত্বে থাকা পরিবেশকের মাধ্যমে কিছু পণ্য অবৈধভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকে চলে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট পরিবেশক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে বহাল রাখা হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বিএটি বিভিন্ন নিরাপত্তা কোম্পানিকে মধ্যবর্তী স্তর বা ‘বাফার’ হিসেবে ব্যবহার করত। এসব কোম্পানির মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের অবৈধ বাণিজ্যে সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা, তাদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হতো বলে গবেষকদের দাবি। এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের কারখানায় ভুয়া শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন এবং তাদের উৎপাদন ব্যাহত করতে তথ্যদাতা ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়ার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা।
অবৈধ বাণিজ্যের যুক্তি কি তামাক নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতায় ব্যবহৃত হয়?
গবেষক বেনোয়া গোমিসের মতে, তামাক কোম্পানিগুলো প্রায়ই এমন গবেষণায় অর্থায়ন করে, যেখানে অবৈধ বাণিজ্যের ব্যাপ্তি প্রকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি করে তুলে ধরা হয়। এসব গবেষণার মাধ্যমে তামাকের ওপর উচ্চ কর ও কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে অবৈধ বাণিজ্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পরে তামাক কোম্পানিগুলো নীতিনির্ধারকদের কাছে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে এসব গবেষণা ব্যবহার করে।
তবে গবেষকদের বক্তব্য, যেসব দেশে তামাকের ওপর কর বেশি এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কঠোর, সেসব দেশে অবৈধ বাণিজ্যের মাত্রা সাধারণত কম। এর একটি কারণ হলো, এসব দেশে অবৈধ বাণিজ্য মোকাবিলার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি এসব দেশ বৈধ ও অবৈধ—উভয় ধরনের সিগারেটের ব্যবহার কমাতে সক্ষম হয়েছে।
গবেষক অ্যালেন গ্যালাঘারের মতে, সরকার যখনই কোনো তামাক নিয়ন্ত্রণনীতি প্রস্তাব করে বা বাস্তবায়ন করে, তখন তার বিরোধিতায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত যুক্তিগুলোর একটি হলো—এতে অবৈধ বাণিজ্য বাড়বে।
তবে গবেষকরা অবৈধ বাণিজ্যের বাস্তব অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। তাঁদের বক্তব্য, এ সমস্যা মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট নীতি ও কার্যক্রম প্রয়োজন, যা তামাকশিল্পের প্রভাবমুক্ত এবং স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে। এ ক্ষেত্রে তামাক কোম্পানি বা অন্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে একচ্ছত্র ভূমিকা দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন তাঁরা।
জনস্বাস্থ্যে চোরাচালানবিরোধী কর্মসূচির ভূমিকা কতটা?
তামাক কোম্পানিগুলোর দাবি, চোরাচালানবিরোধী অভিযান জনস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কারণ, কালোবাজারে সস্তা সিগারেটের সহজলভ্যতা মানুষকে ধূমপান ছাড়তে বাধা দেয়। তবে গবেষক অ্যালেন গ্যালাঘারের বক্তব্য, তামাক কোম্পানিগুলোর পরিচালিত এসব কর্মসূচি ধূমপায়ীর সংখ্যা কমাতে কার্যকর হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বেনোয়া গোমিসের মতে, তামাক কোম্পানিগুলোর অবৈধ বাণিজ্যবিরোধী কর্মসূচি মূলত নিজেদের ভাবমূর্তি নতুনভাবে প্রতিষ্ঠার কৌশল। এর মাধ্যমে তারা সরকারের কাছে বৃহত্তর জনস্বার্থে কাজ করা অংশীদার হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চায়।
গবেষকদের উপসংহার, বিএটি’র এসব কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য জনস্বাস্থ্য রক্ষা বা অবৈধ বাণিজ্য নির্মূল করা ছিল না। বরং নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি, নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার এবং নিজেদের সুনাম বাড়ানোই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
বাংলাদেশেও গেল কয়েক বছর ধরে নকল সিগারেট কারখানার খবর আসছে বিভিন্ন ফেসবুক পেইজ, ওয়েব সাইটে। যেখানে দেখানো হচ্ছে নকল সিগারেটের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার ইত্যাদি। কিন্তু এসব নকল সিগারেট ও রাজস্ব হারানোর জুজুর ভয় দেখানোর পেছনে কলকাঠি নাড়ানোর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বিএটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। অথ্যাৎ চোরাচালান ও নকল সিগারেটের মিথ দিয়ে এনবিআরকে ভয় দেখানো ও নীতি নির্ধারকদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের ব্যাপারে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকোর অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ তা আরও একবার তুলে ধরেছেন গবেষকদ্বয়।
তথ্যসূত্র
২. https://www.jugantor.com/tp-bangla-face/928340
৩. গবেষণার প্রতিবেদনটি পড়তে পারেন এই লিংকে; https://www.theexamination.org/articles/british-american-tobacco-illicit-trade
৪. মূল গবেষণার লিংক; https://tobaccocontrol.bmj.com/content/early/2026/10/01/tc-2024-058843?