• Call: +8801712657540
  • Email: sinhasmp@yahoo.com
সিগারেটের প্রতি শলাকায় ১ টাকা স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপ কেন জরুরি
September 14, 2025
সিগারেটের প্রতি শলাকায় ১ টাকা স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপ কেন জরুরি

বিশ্বের যে কয়টি দেশের সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের কর কাঠামো জটিল তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। এক অর্থে বলা যায়, এমন বহুস্তর বিশিষ্ট সিগারেটের কর কাঠামো সচরাচর দেখা যায় না। বাংলাদেশের  সিগারেটের ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম, উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ম এই চারটি স্তর বা সেগমেন্ট রয়েছে।  জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তামাকজাত পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের সময় বিড়ি, জর্দা-গুলসহ সিগারেটের সবোর্চ্চ খুচরা মূল্য বেঁধে দেয় এনবিআর। আর এই বেঁধে দেয়া সবোর্চ্চ খুচরা মূল্য- এমআরপির মধ্যেই অর্ন্তভুক্ত থাকে সিগারেট তৈরির কাঁচামালের মূল্যসহ উৎপাদন খরচ, ব্যাংকের সুদ, কোম্পানির কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ট্রেড মার্জিন, কোম্পানির মুনাফা এবং সরকারের যাবতীয় ট্যাক্স-ভ্যাট। আর এই ট্যাক্স ভ্যাটের মধ্যে রয়েছে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা মূসক, ৬৭ শতাংশ সম্পুরক শুল্ক (এসডি) এবং ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ।

সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের মূল্য ও কর নির্ধারণী হয়  অ্যাড ভেলোরাম প্রক্রিয়ায়। সহজ কথায় অ্যাড ভেলোরাম ব্যবস্থা হলো, কোনো পণ্যের  সবোর্চ্চ খুচরা মূল্যের ওপর কর নির্ধারণী প্রক্রিয়া। যা শতাংশ হারে আরোপ করা।১ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি সিগারেটের কর কাঠামোর মধ্যে রয়েছে অ্যাড ভেলোরাম ও স্পেসিফিক ট্যাক্স বা সুনির্দিষ্ট কর প্রথা। বাংলাদেশ যেমন শুধু অ্যাড ভেলোরাম প্রক্রিয়ায় কর আরোপ ও মূল্য নির্ধারণ করে। অনেক দেশ আছে যারা আবার

স্পেসিফিক বা সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালু রেখেছে। আবার অনেক দেশ অ্যাড ভেলোরামের পাশাপাশি স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপ করে অর্থাৎ মিক্সড ম্যাথড ব্যবহার করে।

অ্যাড ভেলোরামের সমস্যা : সিগারেটসহ তামাকজাত দ্রব্যে অ্যাডভেলেরাম ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হলো সবোর্চ্চ খুচরা মূল্যের ওপর শতাংশ আকারে কর ও দাম নির্ধারণ। কারণে এই পদ্ধতিতে তামাক কোম্পানিগুলো বাড়তি সুবিধা পায়। কোম্পানি কোনো ধরনের বাড়তি খরচ-পরিশ্রম ছাড়াই বাড়তি মুনাফা করার সুযোগ পায়। যা বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে হয়ে আসছে। এই অ্যাড ভেলোরাম ব্যবস্থায় মূল্য ও কর নির্ধারণের কারণে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সিগারেট কোম্পানির আয়।

উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক,  চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২০ শলাকার এক প্যাকেট নিম্ন স্তরের সিগারেটের সবোর্চ্চ খুচরা মূল্য ১০০ টাকা, যেখানে মোট করভার ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি প্যাকেটে ৮৩ টাকা রাজস্ব হিসাবে পাবে সরকার। আর বাকি ১৭ টাকা পাবে সিগারেট কোম্পানি।

আগামী অর্থবছরে ২০ শলাকার ঐ এক প্যাকেট নিম্ন স্তরের সিগারেটের সবোর্চ্চ খুচরা মূল্য ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০ টাকা নির্ধারণ করলো এনবিআর। আর মোট করভার আগের মতোই ৮৩ শতাংশ পুনর্বহাল থাকলো। তাহলে দেখা যাবে, ১২০ টাকার মধ্যে ৯৯ টাকা ৬০ পয়সা রাজস্ব পাবে সরকার। সেই হিসাবে বর্ধিত দামের কারণে সরকারের রাজস্ব আয় ৮৩ টাকা থেকে বেড়ে হলো ৯৯ টাকা ৬০ পয়সা। বৃদ্ধি ১৬ টাকা ৬০ পয়সা। বিপরীতে তামাক কোম্পানির লাভ ১৭ টাকা থেকে বেড়ে হবে ২০ টাকা ৪০ পয়সা। কোম্পানির বাড়তি পেলে ৩ টাকা ৪০ পয়সা। উল্লেখ্য, এখানে সিগারেট কোম্পানির বাড়তি কোনো বিনিয়োগ ও খরচ ছাড়াই প্রতি প্যাকেটে বাড়তি ৩ টাকা ৪০ পয়সা করে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন প্রতি প্যাকেটে প্রায় সাড়ে তিন টাকা বাড়তি আয় এ আর এমন কী?

উত্তরটা মিলবে এবং চক্ষু চড়কগাছ হবে নিম্ন স্তরের সিগারেটের উৎপাদনের তথ্য মেলালে।২ এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিম্ন স্তরে ৬ হাজার ৩৪৩ কোটি শলাকা সিগারেট উৎপাদন হয়েছিল। ২০ শলাকার প্যাকেটে হিসাব করলে দাঁড়ায় ৩১৭ কোটি প্যাকেট। এখন প্রতি প্যাকেটে ৩ টাকা ৪০ পয়সা বেশি পেলে সিগারেট কোম্পানির মোট বাড়তি আয় হবে ১ হাজার ৭৭ কোট টাকা।

মনে রাখতে হবে এই অ্যাড ভেলোরাম প্রথার কারণে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে তামাক কোম্পানির বাড়তি ১ হাজার কোটি টাকার বেশি আয়ের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে । এ্ই অ্যাড ভেলোরাম ব্যবস্থার কারণে ১০ বছরে সিগারেটের দ্বিগুণ উৎপাদন দিয়ে প্রায় ৫ গুণ নীট মুনাফা করার সুযোগ পেয়েছে বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানি ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ-বিএটিবি।৩  একইভাবে অন্য কোম্পানিগুলোও মুনাফা করেছে।

অ্যাড ভেলোরাম ব্যবস্থা বজায় থাকলে মুনাফা বাড়বে সিগারেট কোম্পানির। আর কোম্পানির বাড়তি মুনাফা মানে এই মৃত্যুবিপণন ব্যবসায় নতুন নতুন বিনিয়োগ করবে, সিগারেট থেকে ই-সিগারেট কারখানা করে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি ডেকে আনবে

সমাধান : অ্যাড ভেলোরামের সাথে যোগ করতে হবে সুনির্দিষ্ট কর

আগের উদাহরণ অনুযায়ী, অ্যাড ভেলোরাম ব্যবস্থায় ২০ শলাকার প্যাকেটে ২০ টাকা বৃদ্ধি মানে প্রতি শলাকায় ১ টাকা করে দাম বাড়ানো হয়েছিল। এই বর্ধিত ২০ টাকার মধ্যে ৮৩ শতাংশ হিসাবে সরকারের রাজস্ব ১৬ টাকা ৬০ পয়সা আর বাকী ৩ টাকা ৪০ পয়সা যাবে কোম্পানির পকেটে। সাপ মরবে কিন্তু লাঠি ভাঙ্গবে না প্রবাদের মতো সিগারেটসহ তামাকজাত দ্রব্যের দাম বাড়বে। কিন্তু কোম্পানি বাড়তি মুনাফা করার সুযোগ পাবে না। আর এর জন্য প্রয়োজন স্পেসিফিক ট্যাক্স ব্যবস্থা। স্পেসিফিক ট্যাক্স জটিল কিছু নয় এবং বাংলাদেশে বহুবিধ পণ্যে এই সুনির্দিষ্ট ট্যাক্স আরোপ করা আছে। যার মধ্যে ইট, টেলিভিশন, মোবাইল সিম অন্যতম।

আগের উদাহরণের মতোই নিম্ন স্তরে প্রতি শলাকা সিগারেটে ১ টাকা করে স্পেসিফিক ট্যাক্স বসিয়ে প্রতি প্যাকেটে ২০ টাকা বাড়ানো হলো। তাহলে এখানেও ভোক্তাদের ওপর দাম বৃদ্ধি হবে ২০ টাকা। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ২০ টাকাই সরকারের কোষাগারে রাজস্ব হিসাবে জমা হবে। ১ টাকা সুনির্দিষ্ট কর বা স্পেসিফিক ট্যাক্স হওয়ায় বর্ধিত দামে তামাক কোম্পানির কোনো অংশ থাকবে না।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিম্ন স্তরের সিগারেটের উৎপাদন ছিল ৬ হাজার ৩৪৩ কোটি শলাকা। তাহলে প্রতি শলাকায় ১ টাকা করে স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপ করলে নিম্ন স্তরেই সরকারের বাড়তি রাজস্ব আয় হবে ৬ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। তখন নিম্ন স্তরে সিগারেটের মোট করভার হবে ৮৪ শতাংশ অর্থাৎ ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের সাথে ১৫ শতাংশ মূসক, ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারসার্জ এবং ১ টাকা সুনির্দিষ্ট কর বা স্পেসিফিক ডিউটি। বিদ্যামান অ্যাড ভেলোরাম প্রথার সাথে যুক্ত হবে স্পেসিফিক ট্যাক্স বা সুনির্দিষ্ট কর। এটাকে মিক্সড ম্যাথড বলে।

জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিশ্বের অনেক দেশেই এই উভয় ধরনের ট্যাক্স ব্যবস্থা চালু আছে। বাংলাদেশেও তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে এই অ্যাড ভেলোরামের সাথে স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপ করা এখন সময়ের দাবি।

শলাকা প্রতি ১ টাকা  স্পেসিফিক ট্যাক্সের গুরুত্ব ও উপকারিতা

শুধু নিম্ন স্তরে নয়, স্তর নির্বিশেষে প্রতি শলাকা সিগারেটে ১ টাকা করে সুনির্দিষ্ট কর বসালে সরকার ৮ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব পাবে। বিদ্যামান অ্যাড ভেলোরামের সাথে এই টাকা বাড়তি যোগ হবে সরকারের কোষাগারে।

দ্বিতীয়ত, পুরো টাকা রাজস্ব পাওয়ার পাশাপাশি কোন স্তরে কত টাকা বাড়লো তা নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ পাবে না সিগারেট কোম্পানিগুলো। এতে বাজার নজরদারি করাও সহজ হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর। কারণ সুনির্দিষ্ট কর পাওয়ার বিষয়টি সিগারেটের শলাকার সংখ্যার ওপর হিসাব হবে।

তৃতীয়ত, আগের মতো মূল্য বৃদ্ধির কারণে সিগারেটের দামে ভাংতি বা খুচরা পয়সার বিড়ম্বনাও থাকবে না। ১০ শলাকার প্যাকেট হলে ১০ টাকা বাড়তি, ১২ শলাকার প্যাকেট হলে ১২ টাকা আর ২০ শলাকার প্যাকেট হলে ২০ টাকা বাড়তি সুনির্দিষ্ট কর পাবে সরকার। যা সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একইসাথে রাজস্ব হিসাব ও সংগ্রহেও সুবিধা পাবে এনবিআর। ফলে  আগামী অর্থবছরে সিগারেটের কর কাঠামোয় অ্যাড ভেলোরামের সাথে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা জরুরি।

লেখক  পরিচিতি:  সুশান্ত সিনহা, বিশেষ প্রতিনিধি, একাত্তর টেলিভিশন ও তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক।

ইব্রাহিম খলিল, সিনিয়র প্রজেক্ট এন্ড কমিউনিকেশন অফিসার, অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তথ্য সূত্র:১. https://tinyurl.com/ycka7juz

২. https://www.sushantaksingha.com/2025/09/06/unpacking-mrp-violations-how-cigarette-companies-exploit-consumers-and-avoid-taxes/

৩.  https://wclh2020.abstractserver.com/WCLH2020_abstract_book_high.pdf