• Call: +8801712657540
  • Email: sinhasmp@yahoo.com
‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণ ঠেকাতে কোম্পানির প্রোপাগান্ডা ও বাস্তবতা’
‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণ ঠেকাতে কোম্পানির প্রোপাগান্ডা ও বাস্তবতা’

গত ৩ ডিসেম্বর ২০২৫, সকাল ১১টায় বিএনটিটিপি আয়োজন করে ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণ ঠেকাতে কোম্পানির প্রোপাগান্ডা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক ওয়েবিনার। এতে গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের  সাবেক ন্যাশনাল প্রফেশনালস ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ হেলথ ইকোনমিক্সের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক বজলুর রহমান, এবং একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক গবেষক সুশান্ত সিনহা

ওয়েবিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনটিটিপির প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল, এবং সঞ্চালনা করেন সিনিয়র প্রকল্প কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও কোম্পানির প্রোপাগান্ডা: সুশান্ত সিনহার বক্তব্য

১. তামাকের নিকোটিন আসক্তি: এক ব্যক্তিগত যুদ্ধ

তামাক একটি পূর্ণাঙ্গ আসক্তিজাত পণ্য।  মানুষ জানে এটি ক্ষতিকর, তবুও নিকোটিনের কারণে সহজে তা ছাড়তে পারে না। অন্যান্য অভ্যাস পরিবর্তনের মতো এখানে কোনো সহজ পথ নেই; প্রতিটি ধূমপায়ীকে প্রতিনিয়ত নিজস্ব এক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

২. সিগারেট ছাড়া সহায়ক পরিবেশের মারাত্মক অভাব

ধূমপান ছাড়ার জন্য সহায়ক পরিবেশ অপরিহার্য—কিন্তু আমরা এখনো তা তৈরি করতে পারিনি। রাস্তাঘাট, দোকান, বাজার—সব জায়গায় সিগারেট এমনভাবে হাতের নাগালে থাকে যে প্রলোভন এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।বাস থামলেই কন্ট্রাক্টর এসে সিগারেট বিক্রি করছে; ড্রাইভার–হেলপার সেখানেই টান দিচ্ছে। এমনকি যেসব এলাকা ধূমপানমুক্ত হওয়ার কথা—বাস, অফিস, হাসপাতাল—সেগুলোর অবস্থা এখনো উদ্বেগজনক।

যেমন: কয়েকদিন আগে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যাই। হাসপাতালের গেটের ভেতর দাঁড়িয়ে মানুষ সিগারেট খাচ্ছে-এমনকি হাসপাতালের স্টাফরাও! এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং বাস্তবায়নের বড় দুর্বলতাকে নির্দেশ করে।

৩. তামাক কোম্পানির ব্যবসা, কৌশল এবং লুকানো মুনাফা

আমার গবেষণা ও অনুসন্ধানে বহুবার দেখিয়েছি—কোম্পানিগুলো উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নানা কৌশলে তাদের লাভ কয়েকগুণ বাড়িয়ে থাকে।

তাদের বড় কৌশলের একটি হলো— বৈধ ব্যবসার পাশাপাশি অবৈধভাবে বাড়তি মুনাফা আদায়

উদাহরণ: ঢাকার বাংলামোটরের দোকানের পোস্টার

সিগারেটের দোকানে একটি স্টিকার লাগানো ছিল—

  • লাকি সিস্টার্স — ১ শলাকা ১০ টাকা
  • লাকি মিন্ট — ১ শলাকা ১০ টাকা
  • লজেন্স — ২ টাকা
  • পানি — ২০ টাকা
  • বাকি চেয়ে লজ্জা দিবেন না”

দেখতে সাধারণ বিজ্ঞাপন হলেও এটি সিগারেট অতিরিক্ত দামে বিক্রির সরাসরি ইঙ্গিত। কোম্পানি ইচ্ছা করে এই পোস্টার দোকানগুলোতে লাগায়।
যে সিগারেটের প্যাকেটের এমআরপি ২০০ টাকা, সেটাকে শলাকা ধরে ১০ টাকা করে বিক্রি করানো হচ্ছে। এটি সরাসরি এমআরপি লঙ্ঘন।  কারণ প্রতি শলাকা ১০ টাকা করে নেয়া হলে মধ্যম স্তরের লাকি সিস্টার্সের ২০ শলাকার এক প্যাকেটের দাম পড়ে ২০০ টাকা্ অথচ এনবিআর কর্তৃক সবোর্চ্চ খুচরা মূল্য বেঁধে দিয়েছে ১৮০ টাকা্। অথ্যাৎ কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিচ্ছে জনগণের কাছ থেকে প্যাকেট প্রতি ২০ টাকা বাড়তি নেয়ার জন্য। এটা পুরোপুরি অবৈধ।

৪. এমআরপি: দেশের সব পণ্যে মানা হয়, শুধু তামাক ছাড়া

বাংলাদেশে সকল পণ্যে সবোর্চ্চ খুচরা মূল্য ( এমআরপি) মানা হয়— যেমন

  • ৫ টাকার লেক্সাস বিস্কুটের প্যাকেট কখনও ৬ টাকায় বিক্রি করতে পারে না
  • ৩ টাকার মিনিপ্যাক শ্যাম্পু ৪ টাকায় কিনতে হয় না ক্রেতাদের
  • ১০ টাকার টিস্যু ১৫ টাকায় নিতে হয় না। কিন্তু সিগারেট? ২০০ টাকার সিগারেটে প্যাকেট সব সময় ২২০–২৪০ টাকায় বিক্রি হয় বেশ কয়েক বছর ধরে আমার গবেষণা,  রিপোর্ট, এনবিআরের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে ২০২৩ সালের জুন মাসে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সিগারেটের প্যাকেটে এমআরপি চালু এবং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন এখনও অসম্পূর্ণ। কিছু কোম্পানি মানছে, বেশিরভাগই মানছে না।

৫. কোম্পানির বাড়তি মুনাফার কৌশল: দোকানদারকে মুনাফাহীন করে দেওয়া

এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশল।

যেমন উদাহরণ:
বেনসন সিগারেটের ২০ শলাকার প্রতি প্যাকেটে সরকার সবোর্চ্চ খুচরা মূল্য বা এমআরপি বেধে দিয়েছে ৩৭০ টাকা। এই সিগারেটের কোম্পানি খুচরা দোকানদারদের কাছে ৩৬৯ টাকা ৯৮ পয়সায়। অর্থাৎ ৩৭০ টাকার এক প্যাকেট সিগারেটে দোকানদারের লাভ বা কমিশন পায় মাত্র ২ পয়সা! কিন্তু ৫ টাকার বিস্কুট বিক্রি করলে যেখানে দোকানদার ১ টাকা কমিশন পায়, ৩৭০ টাকার সিগারেটে সে পায় মাত্র ২ পয়সা! ফলে দোকানদার বাধ্য হয় বাড়তি দামে বিক্রি করতে। এরপর কোম্পানি দোকানে দোকানে লাগিয়ে দেয় বাড়তি দামে সিগারেট বিক্রির আরেক গোপন নির্দেশনা প্রতি শলাকা ২০ টাকা করে বিক্রি করুন।”

ফলে কি হয়. ৩৭০ টাকার বেনসন সিগারেট প্যাকেট কিনতে হয় ৪০০ টাকায়। সবচেয়ে বড় বিষয় এই যে বাড়তি ৩০ টাকা নেয়া হলো সেটা পুরোপুরি কোম্পানির পকেটে গেল। কারণ এই বাড়তি ৩০ টাকার ওপর এক টাকাও রাজস্ব পায় না। অথচ ৮৩ শতাংশ হারে ট্যাক্স হিসাবে সরকারের ২৪ টাকা ৯০ পয়সা পাওয়া কথা । যার পুরোটায় ট্যাক্স ফাঁকি।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিদিন বিক্রি হয় ২১ কোটি শলাকা সিগারেট। শুধু  প্রতি শলাকায় ১ টাকা বেশি নিলেই দিনে বাড়তি আয় ২১ কোটি টাকা। মাসে ৬২০–৬৩০ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৮ হাজার  কোটি টাকা। যা  জনগণের পকেট থেকে অবৈধভাবে নিয়ে যাচ্ছে সিগারেট ব্যবসায়ীরা।

৬. রেভিনিউ প্রসঙ্গে কোম্পানির ‘মিথ’

তামাক কোম্পানি বলে, আমরাই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব দিই।”

কিন্তু এটি ভুল। কারণ—

  • ট্যাক্স, ভ্যাট, শুল্ক—এ সবই ভোক্তা মূল্যের উপর আরোপিত, অর্থাৎ দেয় ভোক্তা। সহজ করে বললে সিগারেটের দামের মধ্যেই যাবতীয় ট্যাক্স-ভ্যাট যুক্ত থাকে এবং সিগারেট কেনার সময় ক্রেতা-ভোক্তা সেই ট্যাক্স-ভ্যাট দিয়েই কেনে। যা কোম্পানির কাছে জমা থাকে। তাই কোম্পানিরি দেয়া রাজস্ব মানেই সেটা ক্রেতার দেয়া ট্যাক্সের টাকা। ফলে সিগারেট থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের ৯৬ শতাংশই দেয় ক্রেতারা। যা কালেকট করে সরকারের কোষাগারে জমা দেয় সিগারেট কোম্পানি। বিপরীতে  কোম্পানিগুলো দেয় কেবল তাদের ইনকাম ট্যাক্স, যা মোট রেভিনিউর মাত্র ৪%।  বাকি সব ট্যাক্স ভোক্তার দেওয়া টাকা। কোম্পানি শুধু সরকারের কাছে জমা দেয়। কিন্তু তারা এটাকে নিজেদের ‘অবদান’ হিসেবে প্রচার করে—এটি সরাসরি বিভ্রান্তি।

৭. নীতিনির্ধারকদের বিভ্রান্ত করার কৌশল

তামাক কোম্পানি নীতিনির্ধারকদের নানা ‘ভীতি’ দেখিয়ে সরকারি নীতি নির্ধারকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
যেমন সিগারেট কোম্পানি প্রায়শ বলে বেড়েয়া তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন হলে ১৫ লাখ মানুষ বেকার হয়ে যাবে।”। কারণ ১৫ লাখ লোক বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করে।

এটি সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। যারা সিগারেট বিক্রি করেন, তারা অন্যান্য আরও ১০ থেকে ১৫ টি পণ্যও বিক্রি করেন। তাই তারা কখনও বেকার হবেন না।

বিষয়টি নিয়ে গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আমি অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে এবং কোম্পানি সৃষ্ট মিথের বিষয়টি তুলে ধরেছিলাম। তিনি যা বললেন তাতে বুঝতে বাকী রইলো না যে সিগারেট কোম্পানির দেওয়া বিভ্রান্তিকর তথ্য উপদেষ্টার কাছে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তামাক বিরোধী এক্টিভিস্টদের পক্ষ থেকে দাবিসহ সঠিক তথ্য উপাত্ত এখনও নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানো এখন অত্যন্ত জরুরি।

বছর খানেক হতে চললো এখন তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন আইন সংশোধন হয় নি। কারণ সরকার নির্দেশিত কমিটি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিষয়গুলো ‘অবজারভেশন’ করছে। এখন প্রশ্ন হলো-  অবজারভেশনেই যদি বছর যায়, তবে অপারেশন—অর্থাৎ বাস্তবায়ন—শুরু হবে কবে?

শেষ কথা

তামাক কোম্পানির প্রচারণা, বিভ্রান্তি, অতিরিক্ত লাভ, আইনের অপব্যবহার—এসবের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।
আমরা দেখেছি—একসঙ্গে কাজ করলে পরিবর্তন আসে। এমআরপি সংস্কার তারই উদাহরণ

এখন আমাদের দায়িত্ব—

  • আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা
  • কোম্পানির অপকৌশল প্রতিহত করা
  • জনস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া
  • সিগারেটের শলাকা প্রতি ১ টাকা করে সুনির্দিষ্ট বা স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপ করা।

সবাইকে ধন্যবাদ।
বিএনটিটিপিকে বিশেষ ধন্যবাদ আমাকে আজকের আলোচনায় যুক্ত করার জন্য।

sinhasmp@yahoo.com

Webinar Link : https://www.youtube.com/live/jEifjjfpyuk