• Call: +8801712657540
  • Email: sinhasmp@yahoo.com
সিগারেট কর কাঠামো ও আসন্ন বাজেট প্রস্তাব নিয়ে আমার মতামত ও বিশ্লেষণ
May 11, 2026
সিগারেট কর কাঠামো ও আসন্ন বাজেট প্রস্তাব নিয়ে আমার মতামত ও বিশ্লেষণ

সিগারেটের কর কাঠামো, নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করার প্রস্তাব এবং আসন্ন বাজেটে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে—এই বিষয়ে দেশকাল নিউজে আমার মতামতসহ অন্যান্যদের মতামত প্রকাশিত হয়েছে। এখানে আমি বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করছি এবং আমার অবস্থান তুলে ধরছি। বাংলাদেশে সিগারেটের নিম্ন স্তর ও মধ্যম স্তর একীভূত করে একটি স্তর করার প্রস্তাব নিয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক ও একাত্তর টেলিভিশনের প্ল্যানিং এডিটর সুশান্ত সিনহা দেশকাল নিউজকে বলেন,

‘‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সিগারেটের বাজারে নিম্ন স্তর এবং মধ্যম স্তর এক করার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি এই মুহূর্তে করাটা আমাদের জন্য বুমেরাং হবে। চারটা স্তরই থাকুক, শুধু প্রতি শলাকায় এক টাকা করে করহার। এক টাকা করে স্পেসিফিক ট্যাক্স—বিদ্যমান অ্যাড ভ্যালোরম প্রথার সঙ্গে। এতে করে রাজস্বটা সরাসরি সরকারের ঘরে যাবে, আর দাম যেটা বাড়বে, তার মধ্য দিয়ে কনজ্যুমারের ওপর প্রভাব পড়বে,’’ যোগ করেন এই তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক।

‘‘আগামী বাজেটে যদি প্রতি শলাকায় এক টাকা করে স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপ করা হয়, তাহলে এর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় ৭-৮ হাজার কোটি থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়বে। বিপরীতে, সিগারেটের সব স্তরের সিগারেটের প্রতি শলাকায় এক টাকা করে যদি দাম বাড়ে, তাহলে এটি একটা বড় জাম্প হবে। কারণ প্রতি শলাকায় যদি এক টাকা করে বাড়ে, তাহলে ২০ শলাকার প্যাকেটে ২০ টাকা, ১০ শলাকার প্যাকেটে ১০ টাকা করে বাড়ছে।

আমাদের দেশে শলাকাপ্রতি এক টাকা কেন বলছি? কারণ আমাদের দেশে ১০ শলাকার প্যাকেট আছে, ২০ শলাকার প্যাকেট আছে, ১২ শলাকার প্যাকেট আছে। সিগারেট বিক্রি সিংহভাগই হয় খুচরা শলাকা বিক্রির মাধ্যমে। তাহলে এটি হলে আর আমার এটি কাউন্ট করতে কোনো সমস্যা হবে না। এনবিআরের কাছ থেকে যেহেতু তারা শলাকাপ্রতি হিসাব দেয়, তাহলে এনবিআর সে অনুযায়ী তার ট্যাক্স আদায় করবে। যদি ৭ হাজার কোটি শলাকা উৎপাদন হয়, তাহলে ৭ হাজার কোটি টাকা আসবে। যদি ৭ হাজার ৫০০ কোটি শলাকা উৎপাদন হয়, তাহলে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাবে সরকার। অর্থাৎ, সিগারেটের উৎপাদন যা হবে, তার ভিত্তিতে সরকার রাজস্ব পাবে।

বিপরীতে যেটা হবে, এই যে কর বাড়িয়ে দামটা এক টাকা করে বাড়বে, এর মধ্য দিয়ে ভোক্তাদের ওপর একটা চাপ তৈরি করবে। যা তার সিগারেট খাওয়া বা কনজাম্পশনটাকে কিছুটা হলেও কমাবে।’’

সুশান্ত সিনহা বলেন,‘‘বাংলাদেশে সব পণ্যে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) মানা হলেও একমাত্র সিগারেট কোম্পানিগুলো এমআরপি মানছে না। উদাহরণস্বরূপ, এক প্যাকেট বেনসন সিগারেটের সরকার নির্ধারিত দাম ৩৭০ টাকা। কিন্তু দোকানদারদের কাছেই সিগারেট কোম্পানি বিক্রি করছে ৩৬৯ টাকা ৯৮ পয়সায়। যে দামে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করার কথা, তার চেয়ে মাত্র ২ পয়সা কমে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছে সিগারেট কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো।

একটা ৫ টাকা দামের লেক্সাস বিস্কুট বিক্রি করলে দোকানদার ৪ টাকায় কিনতে পারে, ১ টাকা কমিশন পায়। একটি পানির বোতল ১০ টাকা দাম হলে তারা ৮ টাকায় কিনে ২ টাকা কমিশন পায়। কিংবা ১০ টাকা দামের যে কোনো পণ্য কিনলে সেখানে ৭ থেকে ৮ টাকায় কিনে কমিশন পায়। সেখানে ৩৭০ টাকার এক প্যাকেট সিগারেট বিক্রেতা মাত্র ২ পয়সা কমিশন পাবে?’’

তার মন্তব্য, ‘‘খুচরা দোকানদারদের মাত্র ২ পয়সা কমিশন দিচ্ছে সিগারেট কোম্পানিগুলো। সেই কারণেই দোকানদার বেশি দামে বিক্রি করছেন। তাকে বেশি দামে বিক্রি করার জন্য তারা দোকানে দোকানে স্টিকার সাঁটিয়ে দেয়। দোকানে গেলেই দেখবেন, ২০ শলাকার সিগারেট,বেনসন প্রতি শলাকা ২০ টাকা। তার মানে বেনসন প্রতি শলাকা ২০ টাকা করে যখন কোম্পানি স্টিকার মেরে দিয়ে যাচ্ছে, ক্রেতারাও কিন্তু ওইভাবেই মনে করছে যে এটির দাম ২০ টাকা করে। ফলে কী হচ্ছে? ২০ শলাকার এক প্যাকেট বেনসন সিগারেটের দাম পড়ছে ৪০০ টাকা। সরকার কিন্তু এটির এমআরপি বেঁধে দিয়েছে ৩৭০ টাকা। তার মানে প্রতি প্যাকেটে ৩০ টাকা করে জনগণের কাছ থেকে বাড়তি নিচ্ছে সিগারেট কোম্পানি।

এই ৩০ টাকা যে নেওয়া হচ্ছে, এটির কোনো ট্যাক্স দেওয়া হচ্ছে না। আমি দীর্ঘদিন ধরে এই গবেষণাটা করছি। শলাকাপ্রতি ১ টাকা করে বাড়তি নেওয়া হচ্ছে গড়ে। তাতে করে প্রতিদিন বাংলাদেশে ক্রেতাদের কাছ থেকে, ভোক্তাদের কাছ থেকে ২০ কোটি টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। দেশে সিগারেট টেন্টেটিভলি প্রতিদিন ২০ থেকে ২১ কোটি শলাকা বিক্রি হয়। তাহলে ১ টাকা করে বেশি নিলে ২১ কোটি টাকা বা ২০ থেকে ২১ কোটি টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে।’’

তাহলে সমাধানটা কী? সমাধানটা কি প্রতিটি সিগারেটের ওপর করহার নির্ধারণ?

সুশান্ত সিনহা বলেন, ‘‘সমাধানটা হচ্ছে, প্রথমত এমআরপি দরে বিক্রিটা নিশ্চিত করা। দোকানদাররা ক্রেতাদের কাছ থেকে যে বাড়তি টাকা আদায় করছে কোম্পানির প্ররোচনায়, দোকানদাররাই যেন এই ৩৭০ টাকার পণ্যটা ৩৪০ টাকা বা ৩৫০ টাকায় কিনতে পারে। সে যেন এমআরপি দামে বিক্রি করতে পারে, সেই ব্যবস্থাটা নিশ্চিত করতে হবে। এটি এনবিআর, ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ এমআরপি ভায়োলেশনটা বড় ভায়োলেশন। অন্য কোনো পণ্যে এই ভায়োলেশনটা হয় না।’’

তাহলে মূল অপরাধটা হলো কোম্পানির? সে দোকানদারকে বেশি দামে দিচ্ছে, তার লাভটা দিচ্ছে না?

সুশান্ত সিনহা বলেন, ‘‘অবশ্যই। তাকে কোনো লাভ দিচ্ছে না, কমিশন দিচ্ছে না। এমআরপি মানা হয় না, কোম্পানিগুলো মানছে না সিগারেটের ক্ষেত্রে। আমার যৌক্তিক দাবি, এবারের বাজেটে দাম না বাড়িয়ে ট্যাক্স বাড়ানোর মধ্য দিয়ে দামটা বাড়ানো যায়। আমি কিন্তু সিগারেটের দাম বাড়ানোর কথা বলছি ট্যাক্স বাড়িয়ে।

যেমন ধরুন, আমি বলছি যে এক টাকা করে নিম্ন থেকে উচ্চ স্তর শলাকা প্রতি নির্বিশেষে, সকল স্তরের সিগারেটে এক টাকা করে স্পেসিফিক ট্যাক্স দেওয়া। বিদ্যমান যে অ্যাড ভ্যালোরম প্রথা আছে, সেই অ্যাড ভ্যালোরম প্রথার সঙ্গে এক টাকা করে স্পেসিফিক ট্যাক্স আরোপ করা।’’

মানে অ্যাড ভ্যালোরম পদ্ধতিতে যা আছে, তাও থাকবে, অতিরিক্ত আরও এক টাকা করে বসবে প্রতি সিগারেটে?

সুশান্ত সিনহা বলেন, ‘‘এক টাকা করে স্পেসিফিক ট্যাক্স বসবে। এক টাকা করে স্পেসিফিক ট্যাক্স যদি বসানো হয়, তাহলে দুটি জিনিস হবে। সিগারেটের প্রতি ১০ শলাকার এক প্যাকেটে ১০ টাকা বাড়বে। তার মানে দামটা বাড়ল, জনগণের ওপর একটা প্রভাব পড়বে। আর এই যে ১০ টাকা, সেই ১০ টাকার পুরোটাই সরকার রাজস্ব আকারে পাবে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কোম্পানির রিটেনশন কমে যাবে? আমি বলছি, কমবে না। কারণ আমি তো অ্যাড ভ্যালোরম প্রথাতে যে কোম্পানির লাভ—৩৭০ টাকায় সে সিগারেট বিক্রি করে তার যে ১৭ শতাংশ লাভ—সেটি তো রাখছি। সেটি তো আমি কোনো কিছু নষ্ট করছি না। বাড়তি যে এক টাকা দাম হবে, সেই এক টাকা সরাসরি এনবিআর পাবে।’’

রিটেনশনটা কী?

সুশান্ত সিনহা বলেন, ‘‘রিটেনশনটা হচ্ছে, ধরেন ১০০ টাকা একটা সিগারেটের দাম। তাহলে ওর মধ্যে সরকার ৮৩ শতাংশ বা ৮৩ টাকা কর পায়। তাহলে বাকি থাকে কত? ১৭ টাকা বা ১৭ শতাংশ। এই ১৭ টাকার মধ্যে দোকানদারদের কমিশন, উৎপাদন খরচ, সিগারেটের সব ধরনের কাঁচামাল, বিপণন, সুদ, হেলথ ডেভেলপমেন্ট সারচার্জ—সমস্ত কিছু যুক্ত থাকে। ফলে এই ১৭ টাকায় যে প্রফিটটা থাকে, সেটা অনেক।

এই ১৭ শতাংশের মধ্যেই উৎপাদন খরচ, কোম্পানির আয়কর, ব্যাংকের সুদ, বিপণনসহ সব খরচের পরও সিগারেট কোম্পানিগুলোর বিশাল পরিমাণ মুনাফা থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি)-এর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল যথাক্রমে ১৭ বিলিয়ন টাকার বেশি। অন্যান্য সিগারেট কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফাও বেশ ভালো। তাই যারা বলেন, সিগারেটের উচ্চ কর আছে, আর বাড়ানো যাবে না,তারা আসলে সঠিক তথ্য তুলে ধরছেন না।

আগেই বলেছি, একটা সিগারেট তৈরি করতে উৎপাদন খরচ দুই টাকার কম লাগে। বেনসনের মতো একটা সিগারেটের প্রতি শলাকার খরচ কিন্তু দুই টাকার কম। কিন্তু এটা বিক্রি হচ্ছে কত? ১৮ টাকায়। তার মানে ১৫ টাকা ৮৩ পয়সা সরকারের ট্যাক্স। বাকি যেটুকু আছে, সেটুকু দিয়েই উৎপাদন খরচ, কাঁচামাল, বেতন-ভাতা, বোনাস, মুনাফা,সমস্ত কিছু চলে।

অ্যাড ভ্যালোরম সিস্টেমে বিদ্যমান যে কাঠামো আছে, এর সঙ্গে এক টাকা করে যদি সুনির্দিষ্ট কর বা স্পেসিফিক ট্যাক্স এই বাজেটে আরোপ করা হয়, তাহলে সরকারের মিনিমাম ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আসবে।’’

অ্যাড ভ্যালোরম করপ্রথা কী?

সুশান্ত সিনহা বলেন, ‘‘অ্যাড ভ্যালোরম হলো, কোম্পানি থেকে যখন সিগারেটটা বের হবে, তখন সরকারি দর, যেটাকে ফ্যাক্টরি প্রাইস বলে—সেই ফ্যাক্টরি প্রাইসের ওপর ভিত্তি করে তারা বলে দেবে যে এই সিগারেটটা এত দামে বিক্রি হবে এবং এর ওপর এত শতাংশ ট্যাক্স হবে। এটিই অ্যাড ভ্যালোরম প্রথা।

আর স্পেসিফিক ট্যাক্স হচ্ছে,প্রতি শলাকাপ্রতি নির্দিষ্ট টাকার কর। অর্থাৎ এটি শতাংশ হিসেবে নয়, টাকার অঙ্কের হিসেবে হবে। আপনি একটা সিগারেটে এক টাকা, দেড় টাকা, দুই টাকা, যাই করেন না কেন, সেটা শতাংশ নয়, নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক হিসেবেই হবে।’’

news link;  https://bangla.deshkalnews.com/finance-and-trade/61406