‘২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে সিগারেটের দাম বৃদ্ধি, তামাকজাত পণ্যের কর কাঠামো এবং এর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সম্প্রতি আমার ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে এ বিষয়ে যে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছি, তার সংক্ষিপ্তসার এখানে উপস্থাপন করা হলো।’
জাতীয় সংসদে আগামী ১১ জুন ২০২৬ বৃহস্পতিবার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হবে। এটি বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। ইতোমধ্যে সিগারেটের দাম বাড়ানোর আলোচনা শুরু হয়েছে। কত টাকা বাড়তে পারে এবং এর প্রভাব কী হতে পারে, সে বিষয়েই আজ আলোচনা করতে চাই।
দাম বাড়ানোর আগেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে সিগারেট কোম্পানি
গত প্রায় এক মাস ধরে সিগারেট কোম্পানিগুলো বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে একটি দোকানে পাঁচ বা ছয় প্যাকেট সিগারেট সরবরাহ করা হতো, সেখানে এখন দুই বা তিন প্যাকেট দেওয়া হচ্ছে। যে দোকানে আগে ১০ প্যাকেট দেওয়া হতো, সেখানে এখন দেওয়া হচ্ছে পাঁচ প্যাকেট। অর্থাৎ সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাজেটের আগে প্রতিবছরই এ ধরনের সংকট তৈরি করা হয়। অনেকেই মনে করেন, সিগারেট এমন একটি পণ্য যা যে কেউ কিনে মজুত করে রাখতে পারে। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। সিগারেট উৎপাদনের পর প্রথমে কোম্পানির গুদামে যায়, সেখান থেকে ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে, তারপর হোলসেলারের কাছে এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছায়। কোথাও কোথাও সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ (এসআর) বা ডিলারদের মাধ্যমেও সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থাই সিগারেট কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ফলে বাজারে সরবরাহ নিয়ে যে কারসাজির অভিযোগ ওঠে, তার জন্য খুচরা দোকানদারদের দায়ী করা কঠিন। বরং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল যেহেতু কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাই প্রশ্নও ওঠে তাদের ভূমিকা নিয়েই।
আমাদের গবেষণা, বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভিন্ন অভিযানের তথ্য থেকে দেখা গেছে, সিগারেটের মূল্য ও সরবরাহ নিয়ে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আগামী বাজেটে কী ধরনের মূল্যবৃদ্ধি আসতে পারে?
বাংলাদেশের সিগারেট বাজার মূলত চারটি স্তরে বিভক্ত—নিম্ন স্তর, মধ্যম স্তর, উচ্চ স্তর এবং প্রিমিয়াম স্তর।
দেশের সিগারেট বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশই নিম্ন স্তরের সিগারেটের দখলে। ডার্বি, হলিউড, পাইলট, নেভি, রয়েলস, শেখ, মেরিস ও ব্ল্যাক ডায়মন্ডের মতো ব্র্যান্ডগুলো এই স্তরে রয়েছে। বর্তমানে নিম্ন স্তরের ১০ শলাকার একটি প্যাকেটের সর্বনিম্ন দাম ৬০ টাকা। অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশে ১০ শলাকার প্যাকেট খুব একটা বিক্রি হয় না। বাস্তবে বিষয়টি উল্টো। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ১০ শলাকার প্যাকেটের বিক্রি বেশ বেশি।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া আভাস অনুযায়ী, নিম্ন স্তরের ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা হতে পারে। অর্থাৎ প্রতি শলাকায় প্রায় এক টাকা করে মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে।
একইভাবে মধ্যম স্তরের সিগারেটেও প্রতি শলাকায় প্রায় এক টাকা করে দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উচ্চ স্তরে থাকা গোল্ড লিফের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে। প্রিমিয়াম স্তরের বেনসন অ্যান্ড হেজেস ও মার্লবোরোর মতো ব্র্যান্ডেও প্রতি শলাকায় প্রায় এক টাকা করে দাম বাড়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন। ১১ জুন বাজেট উপস্থাপনের পর নতুন মূল্য কার্যকর হবে। তার আগে যদি কেউ বাড়তি দামে সিগারেট বিক্রি করে, তাহলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার আগে পুরোনো মূল্যই বহাল থাকার কথা। ফলে বাজেট ঘোষণার আগেই বাড়তি দাম আদায় করা হলে তা কালোবাজারির শামিল।
বাংলাদেশের সিগারেট বাজারে সবচেয়ে বড় অংশীদার ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ। দেশের মোট সিগারেট বাজারের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। এরপর রয়েছে জাপান টোব্যাকো, যাদের বাজার অংশীদারিত্ব প্রায় ১২ শতাংশ। এছাড়া দেশীয় কয়েকটি কোম্পানিরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে, যার মধ্যে আবুল খায়ের গ্রুপ অন্যতম।
এ অবস্থায় সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট কিংবা বাজারে যে কোনো ধরনের অনিয়মের প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থা মূলত তাদের নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হয়।
সবোর্চ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) বাস্তবায়ন করছে না সিগারেট কোম্পানিগুলো
কারণ, আমি আগেই বলেছি, সিগারেটের ক্ষেত্রে এমআরপি বা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বাস্তবে কার্যকর হয় না। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, ২০ শলাকার বেনসন সিগারেটের এক প্যাকেটের গায়ে এমআরপি লেখা আছে ৩৭০ টাকা। অর্থাৎ একজন ভোক্তা সর্বোচ্চ ৩৭০ টাকায় সেটি কিনবেন—এটাই নিয়ম।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন খুচরা বিক্রেতাকে সেই ৩৭০ টাকার সিগারেটই প্রায় ৩৬৯ টাকা ৯৮ পয়সা দামে কিনতে হয় হোলসেলার বা কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটরের কাছ থেকে। অর্থাৎ ৩৭০ টাকার একটি পণ্যে তার কমিশন মাত্র ২ পয়সা। প্রশ্ন হলো, মাত্র ২ পয়সা লাভে কি কোনো দোকানদার ব্যবসা চালাতে পারবেন?
এখানেই মূল সমস্যা। সাধারণভাবে যেকোনো পণ্যের ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা এমআরপির চেয়ে কম দামে পণ্য সংগ্রহ করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১০ টাকার একটি বিস্কুটের প্যাকেট দোকানদার ৮ বা সাড়ে ৮ টাকায় কিনতে পারেন। ফলে নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করেও তার একটি যুক্তিসঙ্গত মুনাফা থাকে।
কিন্তু সিগারেটের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর ধরে একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কোম্পানিগুলো প্রায় এমআরপি মূল্যে পণ্য সরবরাহ করে। ফলে দোকানদারদের লাভের সুযোগ থাকে না। বাস্তবে তখন তারা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করতে বাধ্য হন। এর ফলে অতিরিক্ত অর্থের বোঝা গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর।
আমার দীর্ঘদিনের গবেষণা, সংবাদ প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই এমআরপি লঙ্ঘনের সংস্কৃতি থেকে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ ভোক্তাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে। হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় হতে পারে। মাসে যার পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ প্রতি মিনিটে কয়েক লাখ টাকা দেশের সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এটি কি কেবল একটি ব্যবসায়িক অনিয়ম, নাকি একটি প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক শোষণ?
সিগারেট চোরাচালনে রাজস্ব হারানোর কোম্পানির মিথ :
অনেকে আবার যুক্তি দেন, সরকারের বড় রাজস্ব ক্ষতির কারণ হলো সিগারেটের চোরাচালান। নিঃসন্দেহে চোরাচালান একটি বাস্তব সমস্যা। তবে এটাও সত্য যে বাংলাদেশে শুধু সিগারেট নয়; স্বর্ণ, কাপড়, মসলা, বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য, এমনকি শিল্পকারখানার কাঁচামালও চোরাপথে আসে। তাই চোরাচালানকে সামনে এনে বাজারের অন্যান্য অনিয়মকে আড়াল করার সুযোগ নেই।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একটি ১৫ টাকার পানির বোতল যদি দোকানদার কয়েক টাকা কমিশন নিয়ে বিক্রি করতে পারেন, তাহলে ৩৭০ টাকার একটি সিগারেটের প্যাকেট তিনি মাত্র ২ পয়সা লাভে কেন বিক্রি করবেন? বাস্তবতা হলো, করবেন না। আর সেই কারণেই অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের একটি অলিখিত ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যার দায় শেষ পর্যন্ত সিগারেট কোম্পানিগুলোকেই নিতে হবে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৮,৪০০ কোটি শলাকা সিগারেট বিক্রি হয়। সেই হিসাবে প্রতিদিন বিক্রি হয় ২০ কোটিরও বেশি শলাকা। যদি প্রতিটি শলাকায় গড়ে মাত্র ১ টাকা করে অতিরিক্ত নেওয়া হয়, তাহলে প্রতিদিনই ভোক্তাদের কাছ থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা বেশি আদায় করা সম্ভব।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর ও ভ্যাট। সিগারেটের খুচরা মূল্যের বড় অংশই করনির্ভর। অতিরিক্ত যে অর্থ আদায় করা হচ্ছে, তার একটি বড় অংশের ওপর সরকারেরও কর ও ভ্যাট পাওয়ার কথা। কিন্তু সেই অর্থ যদি আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থাকে, তাহলে একদিকে ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে।
এটি শুধু একটি বাজারগত অনিয়ম নয়; বরং ভোক্তা অধিকার, করনীতি এবং সুশাসনের সঙ্গে জড়িত একটি বড় প্রশ্ন।
বৈধভাবে অবৈধ ব্যবসা করছে সিগারেট কোম্পানিগুলো
আরও একটি বিষয় প্রতি বছরই দেখা যায়। বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ার পর এনবিআর নির্দেশনা দেয় যে পুরোনো মজুদ সিগারেট নতুন দামে বিক্রি করতে হলে প্যাকেটে নতুন মূল্যসংবলিত স্টিকার সংযুক্ত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, পুরোনো মূল্য মুদ্রিত প্যাকেটই মাসের পর মাস বাজারে থাকে, অথচ বিক্রি করা হয় নতুন দামে।
ধরা যাক, একটি প্যাকেটে মুদ্রিত মূল্য ৩৭০ টাকা। বাজেটের পর নতুন মূল্য হলো ৩৯০ টাকা। অনেক ক্ষেত্রে সেই পুরোনো প্যাকেটই ৩৯০ টাকায় বিক্রি করা হয়। ফলে প্যাকেটে প্রদর্শিত মূল্য এবং প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। এই অতিরিক্ত অর্থের হিসাব, কর প্রদান এবং আইনি বৈধতা—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
বছরের পর বছর ধরে চলা এই চর্চাগুলো পর্যালোচনা করা জরুরি। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি কোটি টাকার লেনদেন, সরকারি রাজস্ব এবং ভোক্তাদের স্বার্থ।
এদিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত বাস্তবতাও তামাক শিল্পের জন্য একটি বড় বাজার তৈরি করেছে। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ এবং কর্মক্ষম। বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো জানে, একজন মানুষ যদি কিশোর বয়সেই নিকোটিনে আসক্ত হয়ে যায়, তাহলে তিনি কয়েক দশক ধরে তাদের সম্ভাব্য ক্রেতা হয়ে থাকবেন।
কিশোর- তরুণদের নেশায় আকৃষ্ট করতে ই-সিগারেটের সরবরাহ বাড়াচ্ছে কোম্পানি
এই কারণেই নতুন প্রজন্মকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য বাজারে আনা হচ্ছে—ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট, নিকোটিন পাউচসহ নানা বিকল্প নিকোটিন পণ্য। এগুলো অনেক সময় আধুনিক প্রযুক্তিপণ্য বা সাধারণ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মতো দেখায়। ফলে অভিভাবকেরা অনেক ক্ষেত্রেই বুঝতে পারেন না যে এগুলো আসলে নিকোটিন গ্রহণের মাধ্যম।
সুতরাং শুধু সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধি বা করনীতি নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না; বাজারের স্বচ্ছতা, এমআরপি বাস্তবায়ন, ভোক্তা অধিকার, কর আদায় এবং নতুন প্রজন্মকে নিকোটিন আসক্তি থেকে রক্ষার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
কারণ আজ বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অসংক্রামক রোগ বা এনসিডি (Non-Communicable Diseases)। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মারা যাচ্ছে হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে। এসব রোগ একজনের কাছ থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়ায় না, কিন্তু এগুলোর অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ হলো তামাক ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার।
ধূমপান না করেও ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে অধূমপায়ীরা:
আজ আপনি যদি কোনো ফুটপাথ দিয়ে হাঁটেন, অনেক সময় দেখবেন সামনে দু-তিনজন দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন। তাদের ধোঁয়া আপনার নাকে-মুখে আসছে। আপনি নিজে সিগারেট না খেলেও সেই ধোঁয়ার ক্ষতিকর উপাদান আপনার শরীরে প্রবেশ করছে। এটাকেই বলা হয় প্যাসিভ স্মোকিং বা সেকেন্ড-হ্যান্ড স্মোকিং।
আপনি যেকোনো অফিস ভবন, মার্কেট বা প্রতিষ্ঠানে গেলে প্রায়ই দেখবেন নিচতলার প্রবেশমুখে বা সিঁড়ির পাশে অনেকে ধূমপান করছেন। সেই ধোঁয়া বাতাসে ভেসে থাকে এবং অন্যদেরও তার ক্ষতির মুখে ফেলে। অর্থাৎ আপনি ধূমপান না করেও ধূমপানের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
অনেকে প্রশ্ন করেন—“অমুক তো কখনও সিগারেট খায়নি, তারপরও তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।” হ্যাঁ, হার্ট অ্যাটাকের নানা কারণ থাকতে পারে। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে তামাক ও তামাকজাত পণ্য হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার এবং শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগের অন্যতম প্রধান কারণ।
আরেকটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে। আপনি যদি বাসায় বা পরিবারের সদস্যদের সামনে ধূমপান করেন, তাহলে আপনার সন্তান, স্ত্রী, বাবা-মা বা পরিবারের অন্য সদস্যরাও সেই ধোঁয়ার ক্ষতির শিকার হন। কেউই চান না তার সন্তান অসুস্থ হোক, কিন্তু পরোক্ষ ধূমপানের মাধ্যমে অনেক শিশুই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে।
আমাদের আরও একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। বাংলাদেশে অধিকাংশ মাদকের প্রবেশদ্বার বা ‘গেটওয়ে’ হিসেবে কাজ করে বিড়ি ও সিগারেট। যারা পরবর্তীতে ইয়াবা, মাদকদ্রব্য বা অন্যান্য নেশাজাতীয় পদার্থে আসক্ত হন, তাদের বড় একটি অংশের নেশাজীবনের শুরু হয় ধূমপানের মাধ্যমে।
তাই শুধু সচেতনতা নয়, আইনের কঠোর প্রয়োগও জরুরি। জনসমাগমস্থল, ফুটপাত, অফিসের প্রবেশপথ, গণপরিবহন স্টপেজ কিংবা উন্মুক্ত পাবলিক স্পেসে ধূমপান কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
বিশ্বের অনেক দেশ এ ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জাপানে নির্ধারিত স্থান ছাড়া ধূমপান করা যায় না। অনেক উন্নত দেশে হোটেল বা ভবনের ভেতরে ধূমপান করলে বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রয়েছে। কারণ তারা বুঝেছে, একজনের ধূমপানের অধিকার অন্যের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।
সিগারেটের ছোট্ট মোথাও করে পরিবেশ দূষণ
তামাকের ক্ষতি শুধু মানুষের শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবেশের জন্যও ভয়াবহ। একটি সিগারেটের ফিল্টার বা অবশিষ্টাংশ শত শত লিটার পানি দূষিত করতে পারে। এতে ব্যবহৃত সিন্থেটিক উপাদান ও প্লাস্টিকজাত পদার্থ সহজে মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। ফলে পরিবেশ দূষণ দীর্ঘস্থায়ী হয়।
অন্যদিকে তামাক চাষের জন্য প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ব্যবহৃত হচ্ছে। যে জমিতে খাদ্যশস্য উৎপাদন করা সম্ভব, সেই জমিতে তামাক চাষ বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাজার হাজার একর জমিতে তামাক চাষের পরিমাণ বেড়েছে। এর ফলে খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং কৃষি—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, আগামী বাজেটে তামাক পাতা রপ্তানির ওপর পুনরায় অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হোক। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে তামাক চাষের অযৌক্তিক সম্প্রসারণও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নতুন ধরনের নিকোটিন পণ্যের বিস্তার রোধ করা। বর্তমানে ই-সিগারেট, ভ্যাপ, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট এবং নিকোটিন পাউচ তরুণদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
এসব পণ্য অনেক সময় সাধারণ ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা পেনড্রাইভের মতো দেখতে হয়। ফলে অভিভাবকেরা সহজে বুঝতে পারেন না যে এগুলো আসলে নিকোটিন গ্রহণের মাধ্যম। বিভিন্ন ফ্লেভার, আধুনিক ডিজাইন এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিপণনের মাধ্যমে তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তাই আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, ই-সিগারেট, ভ্যাপ, নিকোটিন পাউচসহ সব ধরনের নতুন নিকোটিন পণ্যকে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় এনে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।
সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। সিগারেটে হাজারো রাসায়নিক উপাদান থাকে, যার মধ্যে বহু উপাদান মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ধূমপান কখনোই নিরাপদ নয়। এটি শুধু ধূমপায়ীর নয়, পরিবার, সমাজ, পরিবেশ এবং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি বড় হুমকি।
আমরা চাই একটি সুস্থ বাংলাদেশ, যেখানে তরুণ প্রজন্ম নিকোটিনের আসক্তি থেকে মুক্ত থাকবে, কৃষিজমি খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হবে এবং জনস্বাস্থ্য হবে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের বিষয়।
আগামী বাজেটে তামাক পাতা রপ্তানির ওপর অন্তত ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
সুশান্ত সিনহা; প্ল্যানিং এডিটর, একাত্তর টেলিভিশন ও জনস্বাস্থ্য গবেষক
sinhasmp@yahoo.com